সেবার জয়দা বেড়াতে গেছি সপরিবারে। সঙ্গে আমাদের বন্ধু দিলীপ সেন। পুরুলিয়ার ছেলে। বাস থেকে জয়দা নামতেই দেখি শুনশান জায়গা। খুব কম লোকজনের চলাফেরা। টাটা থেকে ট্রাকের ইঞ্জিন-কাঠামো যাচ্ছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। রাঁচি রোড ধরে। চলছে কিছু লোকাল যান বাহন। দু তিনটে চায়ের দোকান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমার দুই ছোট ছোট বাচ্চার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা চায়ের দোকানে গেলাম। এক মহিলা চা বানাচ্ছেন, বিস্কুটও আছে। দোকান লাগোয়া মাটির ঘর। মহিলা তরকারিও কাটছেন। কোথাও কোন হোটেল জাতীয় কোন কিছুর সন্ধান নেই। মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম দুপুরে আপনার কাছে খেতে পারি? সহজেই উনি রাজি হয়ে গেলেন। তারপর ওনার মাটির ঘরে ঢুকে আমরা স্নানের প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সুবর্ণরেখা নদীর উদ্দেশে। সুন্দর সুন্দর রঙ-বেরঙের পাথর পড়ে আছে সুবর্ণরেখার পাড়ে। আমার চার বছরের ছেলে নদীর মাঝখানে জলে বসে, জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে অনেক স্নান করল। পাহাড়ি পথ ধরে আমরা অনেক উঁচুতে একটা মন্দিরে উঠে গেলাম। সারা পথে সাদা খয়েরি কালো রঙের ছোট বড় পাথর পড়েছিল অনেক। বেছে বেছে কয়েকটা পাথর কুড়ালাম। নদীতে স্নান আর পাহাড়ি পথ বেয়ে মন্দির থেকে নেমে আসার পর সেই দোকানি মহিলার পরিবেশন করা খাবারের কথা কোনদিন ভুলব না। ঝকঝকে নিকানো দাওয়ায়, কাঁচা শালপাতার থালায় গরম ভাত, পাতলার থেকেও পাতলা ডাল, আলু পোস্ত। সারাক্ষণ মহিলার ডালের বাটি হাতে আমাদের সস্নেহ আপ্যায়ন। সেই খাবারের স্বাদ আজীবন লেগে থাকবে মুখে। ঐ বিদেশ বিভুঁইয়ে দুঃসাহসকে ভর করে যে দুর্ভাবনায় পড়েছিলাম তা কোথায়! সেই অন্ন গ্রহণ, সেই আতিথেয়তা, সেই অসহায়তা, প্রকৃ্তির কোলে অল্পে তৃপ্ত মানুষের সেই সহজ জীবন যাপন আজও আমার শহুরে অবস্থানকে প্রবল ভাবে নাড়া দিতে চায়। অরণ্যের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। নদীর কাছে, গাছের কাছে, মাটির দাওয়ার কাছেই মনে হয় জীবনের সব ক্ষুধার অবসান। মনে হয় আমি একটি পাখির কাছে যেতে চাই, পাখির শিসের কাছে।
Saturday, November 14, 2009
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment