Saturday, November 14, 2009

ঝড় নিয়ে যখন আমরা শহরবাসীরা খিচুড়ি খাওয়ার পরিকল্পনা করছি বা যারা তখনো ঘরে ফেরেনি তাদের ঘরে ফেরার কথা চিন্তা করছি, রেডিও-টিভির খবরের মধ্যে দিয়ে ঝড়ের প্রকৃত রূপটাকে বোঝার চেষ্টা করছি, যা বেশ কয়েকদিনের আলোচনার বিষয় হতে পারে, গাল ভরে গল্প করা যেতে পারে, ঠিক কতক্ষণ লোডশেডিং ছিল, ফ্রিজের কত মাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বিদ্যুতের অভাবে, জলের অভাবে কী কী অসুবিধা হল তখন সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদী বাঁধ ভেঙ্গে গেল। জল ঢুকতে শুরু করল নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে - সাতজেলে, চুনোখালি, মোল্লাখালি, পাথরপ্রতিমা, দাউদপুর। গরু-ছাগল, ঘর-বাড়ি, ধানের গোলা ভেসে গেল। কোন দিকে গেল ভাবার ফুরসত নেই। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে, এক কাপড়ে উঁচু জায়গায় উঠে আসাটাই একমাত্র কাজ। খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ল হাজার হাজার মানুষ।

১১ জুন ২০০৯। কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে কবি সব্যসাচী দেব, অধ্যাপক ইমানুল হক সহ ভাষা ও চেতনা সমিতির বন্ধুরা আর উড়ালের পক্ষ থেকে আমি বিপুল ও দীপঙ্কর যখন বেশ কিছু চাল, ডাল, নুন, লুঙ্গি, শাড়ি, স্যালাইন, ওষুধ নিয়ে একটা নৌকো চেপে হোগলা নদী বেয়ে বেয়ে চন্ডীপুর, গদখালি, রাজাপুর, বাগবাগান পেরোচ্ছি, তখন নদীর দুপারে দলে দলে মানুষ বসে আছে ত্রাণের নৌকোর আশায়। নদীর ধার দিয়ে চলতে চলতে অসংখ্য সুন্দরী ও গরান গাছের সারি, তারই মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা। নৌকো দেখলেই তারা দুহাত নেড়ে গলায় চিৎকার তুলে ডাকাডাকি করছে। আমাদের নৌকো তীরে ভিড়তেই কোথাও সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল মানুষ, কোথাও এ বলে আমায় দাও ও বলে আমায় দাও। আমায় একটা লন্ঠন। আমায় একটা শাড়ি, আমায় একটা লুঙ্গি। কাড়াকাড়ি। একজনকে দিতে গেলে আর একজন ছিনিয়ে নিতে চায়। নৌকোর পাটাতনে দাঁড়িয়ে রিলে করে আমরা শাড়ি জামাকাপড় বিতরণ করছি। অন্নবস্ত্রহীন মানুষ। একসাথে পঞ্চাশ একশ হাত আমাদের দিকে। হাহাকার, চিৎকার, ঠেলাঠেলি। দীপঙ্কর আর ইমানুল অঝোরে কেঁদে ভাসাল নৌকোর ভিতর এসে। এই জায়গাটার নাম ছিল কচুখালি।

No comments:

Post a Comment