Saturday, November 14, 2009

নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী / অনুশ্রী চক্রবর্তী

জীবনে কত কিছুই তো করার ইচ্ছে থাকে। কিন্তু উপায় থাকে না। ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি না যে। ভাল মন্দ কত কিছু পড়তে পড়তে ভাবতে ভাবতে স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। অনেক পথ হাঁটতে হাঁটতে জীবন নদীর প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। নদী পেরনোর অপেক্ষা মাত্র। প্রথম যখন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের কথা পড়েছিলাম, মোমের স্নিগ্ধ আলো হাতে যে আহত সৈনিকদের শিয়রে শিয়রে সারারাত ঘুরে বেড়াত আর তাদের যন্ত্রনার পাশে উপশম হয়ে জেগে থাকত তখন ভাবতাম ঐ জীবনটাই আমার চাই। একটা ধর্মযুদ্ধ আমার চাই। সে যুদ্ধে আমি ফ্লোরেন্সের মত রাত জেগে জেগে সেবা করব যুদ্ধাহত সৈনিকদের। যখন বড় হচ্ছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক ছেলেরা চোরাগোপ্তা পথে ওষুধ নিয়ে গেল বাংলাদেশে। সেই ওষুধে কত জনের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল জানি না। ঐ উদ্যোগ ছিল আমার স্বপ্ন। বিবেকানন্দ পড়তে গিয়ে একটা লাইন বারবার মনে পড়ে জীবের মধ্যেই শিবের বাস। কবির উচ্চারণ জীবনের পাথেয় করতে চেয়েছি তুমি মানুষের হাত ধর সে কিছু বলতে চায়।

ঝড়ের নাম আয়লা। বিধ্বংসী এই ঝড়ের কবলে পড়ে শয়ে শয়ে গাছ উপড়ে গেল মাটি থেকে। যে গাছেরা মাটি আঁকড়ে রাখতে পেরেছিল তাদেরও ডালপালা ভেঙ্গে শহরের রাস্তা নিমেষে জঙ্গলের চেহারা নিল। সমস্ত পশ্চিমবঙ্গবাসীকে সতর্ক করা হল। বিকেল চারটের মধ্যে শহরবাসী বাড়ি ফিরে এল। আমরাও বাড়ি ফিরে এলাম। বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। বাইরে ঝড়ের দাপট। সন্ধ্যা গড়িয়ে যাচ্ছে রাত্রির দিকে। কোন দিকে কোন টেলিভিশনের শব্দ নেই, পাখার শব্দ নেই, জলের পাম্প চলছে না। শুধু গাছের পাতার মধ্যে দিয়ে হাওয়ার নিরন্তর বয়ে চলার শব্দ। প্রকৃতি আজ অন্য রূপে। প্রকৃতি আজ ভয়ঙ্করী। আমরা আজ খুব প্রাকৃতিক হয়ে গেছি। নিশ্চয়ই আজ বেশীর ভাগ বাড়িতেই খিচুড়ি খাওয়ার সিদ্ধান্ত। আমার ছেলে আর আমি গান গেয়ে সময় কাটাচ্ছি। আয় কালবৈশাখি হাওয়া উড়িয়ে নে / শুকনো আবর্জনা ধুলো, মৃত্যু, অপমান...।

ঝড় নিয়ে যখন আমরা শহরবাসীরা খিচুড়ি খাওয়ার পরিকল্পনা করছি বা যারা তখনো ঘরে ফেরেনি তাদের ঘরে ফেরার কথা চিন্তা করছি, রেডিও-টিভির খবরের মধ্যে দিয়ে ঝড়ের প্রকৃত রূপটাকে বোঝার চেষ্টা করছি, যা বেশ কয়েকদিনের আলোচনার বিষয় হতে পারে, গাল ভরে গল্প করা যেতে পারে, ঠিক কতক্ষণ লোডশেডিং ছিল, ফ্রিজের কত মাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বিদ্যুতের অভাবে, জলের অভাবে কী কী অসুবিধা হল তখন সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদী বাঁধ ভেঙ্গে গেল। জল ঢুকতে শুরু করল নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতে - সাতজেলে, চুনোখালি, মোল্লাখালি, পাথরপ্রতিমা, দাউদপুর। গরু-ছাগল, ঘর-বাড়ি, ধানের গোলা ভেসে গেল। কোন দিকে গেল ভাবার ফুরসত নেই। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে, এক কাপড়ে উঁচু জায়গায় উঠে আসাটাই একমাত্র কাজ। খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ল হাজার হাজার মানুষ।

১১ জুন ২০০৯। কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে কবি সব্যসাচী দেব, অধ্যাপক ইমানুল হক সহ ভাষা ও চেতনা সমিতির বন্ধুরা আর উড়ালের পক্ষ থেকে আমি বিপুল ও দীপঙ্কর যখন বেশ কিছু চাল, ডাল, নুন, লুঙ্গি, শাড়ি, স্যালাইন, ওষুধ নিয়ে একটা নৌকো চেপে হোগলা নদী বেয়ে বেয়ে চন্ডীপুর, গদখালি, রাজাপুর, বাগবাগান পেরোচ্ছি, তখন নদীর দুপারে দলে দলে মানুষ বসে আছে ত্রাণের নৌকোর আশায়। নদীর ধার দিয়ে চলতে চলতে অসংখ্য সুন্দরী ও গরান গাছের সারি, তারই মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা। নৌকো দেখলেই তারা দুহাত নেড়ে গলায় চিৎকার তুলে ডাকাডাকি করছে। আমাদের নৌকো তীরে ভিড়তেই কোথাও সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল মানুষ, কোথাও এ বলে আমায় দাও ও বলে আমায় দাও। আমায় একটা লন্ঠন। আমায় একটা শাড়ি, আমায় একটা লুঙ্গি। কাড়াকাড়ি। একজনকে দিতে গেলে আর একজন ছিনিয়ে নিতে চায়। নৌকোর পাটাতনে দাঁড়িয়ে রিলে করে আমরা শাড়ি জামাকাপড় বিতরণ করছি। অন্নবস্ত্রহীন মানুষ। একসাথে পঞ্চাশ একশ হাত আমাদের দিকে। হাহাকার, চিৎকার, ঠেলাঠেলি। দীপঙ্কর আর ইমানুল অঝোরে কেঁদে ভাসাল নৌকোর ভিতর এসে। এই জায়গাটার নাম ছিল কচুখালি।

বাগবাগানে আমাদের অভ্যর্থনার জন্য সঙ্গ নিল কয়েকজন। আয়লা দুর্গতদের জন্য একটি যৌথ রান্নাঘর খোলা হয়েছে। বাগবাগানের ঘাটে নৌকো বাঁধা রইল। চালের বস্তা, আলুর বস্তা, শাড়ি, লুঙ্গি নিয়ে আমরা চললাম গ্রামের ভেতরে ইঁট পাতা রাস্তার ওপর দিয়ে। রাস্তার দুপারে পলিথিনের নীল কালো শীট দিয়ে অগণিত ছাউনি বাঁধা। দুপাশের ধানি জমি জলে ডুবে আছে। কলাগাছেরা ধরাশায়ী পরপর। মাটির বাড়ি কাত হয়ে আছে চালাহীন। এখানে যৌথ রান্নাঘরে বারোশো গ্রামবাসী ক্ষুন্নিবৃত্তি করছে। ভাতের সঙ্গে আলু হলেই চলে। রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্দ্ধে এঁদের সংগঠন। নিজেদের টিকিয়ে রাখা, বেঁচেবর্তে থাকা। মানুষ এখানে বেশ শান্ত। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না কাঙালের মত। সুশৃঙ্খল। সংগঠকেরা বেশ উদ্যোগী। কিন্তু কতদিন টানবে এই রান্নাঘর! আমরা জনা কুড়ি যারা কোলকাতার সুসজ্জিত গৃহকোণ ছেড়ে ত্রাণ নিয়ে একদিনের জন্য মানুষের পাশে সরাসরি দাঁড়াব বলে এসেছি, মানুষের হাত ধরব বলে এসেছি, মানুষের চোখে চোখ রাখব বলে এসেছি, তারা হা-অন্নের ঐ অন্নে ভাগ বসালাম। শালপাতায় গরম মোটা চালের ভাতের সাথে আলুর ঘন তরকারি। আমরা ঈশ্বরের প্রসাদ প্রাপ্ত হলাম।

খুব শান্ত তিন রমণী আমায় ঘিরে ধরল। বলল দেখলে দিদিগো আমাদের ঘর বাড়ি। ঐ দেখ মাটির দেওয়াল জলে ডুবে আছে। ঐ যে জলের মধ্যিখানে, ঐটা আমার ঘর ছিল। চালাটা যে কোথায় উড়ে চলে গেল? ওরা যখন কথা বলছিল ওদের কন্ঠস্বর খুব শান্ত শোনাচ্ছিল। সবচেয়ে যে কম বয়সী, পরনের নীল রঙের শাড়ি গায়ে জড়ানো, ব্লাউজবিহীন শরীরের ভরপুরতা আমার চোখে পড়ছিল বার বার। বলল কিছু নেই গো দিদি, আমার বড় মেয়ের বাচ্চাটাকে সামলাতে গিয়ে কিছুই রাখতে পারিনি। ওই যে গাছটা দেখছ ঐ গাছে নৌকো বেঁধে তিনদিন নৌকোর ওপর ছিলাম। এই শাড়িটা শহরের বাবুরা দিয়ে গেল। সরকার থেকে একদিন ছয় কিলো আর একদিন চার কিলো চাল দিল পরিবার পিছু। নৌকো করে বাবুরা এসে মুড়ি দিয়ে যাচ্ছে চিঁড়ে দিয়ে যাচ্ছে তাই খেয়ে খেয়ে থাকছি গো। কিন্তু কতদিন

চারপাশ জলে ভেসে আছে, বাঁধ ভেঙ্গে গেছে সাতজেলের এই ব্লকে। রোজ জোয়ারের জল ঢুকে পড়ছে। চাষের জমি বলতে কিছু নেই। সব জলে ডুবে আছে। যতদূর চোখ যায় জল আর জল। প্রথম তিনদিন খুব কান্না পেয়েছিল গো দিদি। এখন চোখে জল আসে না। আমাদের সারা বছর ধানে চালে, মাছ ধরে হয়ে যেত, এখন কী হবে গো দিদি! উদাস চোখে চেয়ে থাকা নারীরা কি হাল ছেড়ে দিচ্ছে! এখানে দূরের গ্রামে ত্রাণ দিয়ে ফেরার পথে ঐ তিন নারী আমার সঙ্গে সঙ্গে চলল নানা কথা বলতে বলতে। তখন সূর্য অস্তাচলের পথে। উঁচু-নীচু, এবড়ো- খেবড়ো পথ ধরে অনেকটা এলাম। এসে দেখি ভাটায় নৌকো অনেকটা দূরে সরে গেছে। বেশ খানিকটা অংশ কাদা ভাঙতে হবে। আমার এসব ভালই লাগে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে একটু যাবার পরই কাদায় নামতে হবে। কাঠের সিঁড়িতে উঠে নৌকোর দিকে যাচ্ছি, দেখি সেই নীল শাড়ি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এস দিদি আমার হাত ধর। আমি তোমায় নিয়ে যাচ্ছি। ভয়ের কিছু নেই। আমি ঝুপ করে এক হাঁটু কাদায় নেমে পড়লাম। আমার হাত চেপে ধরে নীল শাড়ি আমাকে নৌকোয় উঠিয়ে দিল। তারপর দেখি একটু একটু করে নৌকো ঘিরে ধরেছে গ্রামবাসী ত্রাণের আশায়। কিছু কিছু জিনিস দেওয়া হতে লাগল। আমার সেই তিন নারীও আছে ওদের দলে। ইমানুলের কাছে তিনটে নতুন শাড়ি চাইতেই, শাড়ি এগিয়ে দিল। এগিয়ে দিতেই দীপঙ্কর ইমানুলের হাত থেকে শাড়ি তিনটে নিয়ে নিল। আমি পেছন থেকে চিৎকার করে উঠলাম দীপঙ্কর আমি দেব, ঐ শাড়ি আমি দেব ওদের। দীপঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে শাড়ি তিনটে আমার হাতে তুলে দিল। আমি ভিড়ের মাঝে ওই তিন নারীর হাতে তুলে দিলাম তিনটে নতুন শাড়ি। আমার আনন্দ হল। কেন জানিনা খুব আনন্দ হল। ওরা আমার হাত ধরেছিল বলে আনন্দ হল! ওদের ভাষা বুঝতে চেয়েছিলাম বলে আনন্দ হল! নতুন শাড়ি দিতে পেরে আনন্দ হল!

সন্ধ্যা নেমে এল। চারদিক অন্ধকার। নদীর বুকে আমরা তখনো ভাসছি। ঘরে ফিরছি আমরা অনেকে মিলে। আকাশে সপ্তর্ষিমন্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবতারা খুঁজছি। নিকষ কালো রাত্রিতে তারা ভরা আকাশ। আমাদের ফেলে ফেলে যাওয়া গ্রামগুলিতে, কোথাও কোথাও ছোট ছোট আলো জ্বলছে। ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট আশা কে রাখে খবর তার কে যেন গুন গুন করে গাইছে। নৌকোর পাটাতনের ওপর চুপচাপ বসে আছে কয়েকজন। কেউ কেউ সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

কী হবে ওদের যাদের ফেলে রেখে যাচ্ছি। এই বিরাট দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস মানুষকে কতটুকু সহায়তা করতে পারে! মানুষের এই বাড়িয়ে দেওয়া হাত মানুষকে ভিখিরি করে তুলবে না তো? কচুখালির সেই বয়স্ক লোকটার কথা মনে পড়ল। মানুষের বাড়ানো হাতের পাশ দিয়ে যার গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এসেছিল আপনারা এ ভাবে কতদিন দেবেন? আমাদের কাজ দিন, আমাদের কাজ দিন

পাখির কাছে, পাখি শিসের কাছে / অনুশ্রী চক্রবর্তী

আমাদের সারা জীবন ধরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে নানা রকম খাওয়া দাওয়া। সে সব খাওয়ার সঙ্গে স্মৃতি জড়িত, মাঠ ঘাট নদী জল জড়িত। যখন একটু বড় হয়েছি, তখন গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়তাম। তারপর কোথায় নুন কোথায় তেল! সেই আম মাখা হচ্ছে। আমার সঙ্গে থাকত বেশ কয়েকটি ধুলো মাখা ছেলেমেয়ে। কোঁচড় ভর্তি করে কষ্টা পেয়ারা চুরি করে দৌড়াতাম তেঁতুলতলার দিকে। এক এক কামড়ে থাকত আবিষ্কারের আনন্দ। আমাদের বাড়ির পাশের তেতুঁল গাছ থেকে তেঁতুল পাড়ার অক্লান্ত চেষ্টা করতাম, ঢিল মেরে, লগি দিয়ে খুঁচিয়ে। তেঁতুল পেতাম য সামান্য, হয়ত একটা ছড়া মাত্র। সে একটা সময় ছিল, সব সময় কী যেন খুঁজছি। আম খুজঁছি, জাম খুঁজছি, ফলসা খুঁজছি, বাসব পাতা থানকুনি পাতা তুলসি পাতা খুঁজছি, জল থেকে কলমি শাক শাপলা তুলছি, খাব বলে। মাঠ ঘাট থেকে কুড়িয়ে খাওয়ার জন্যই যেন বাঁচা।

আমাদের বাড়িতে চারটে বড় বড় পিঁড়ি ছিল। আমরা ওই পিঁড়িতে চার ভাই বোন আসন করে বসে ভাত খেতাম। আমার মা উনুনের পাড়ে বসে আমাদের খাবার পরিবেশন করতেন। মার ডান দিকে থাকত কয়লার ঝুড়ি, একটা হাত পাখা, সামনে পাতা থাকত শিলনোড়া। কোঁচড়ে থাকত একটা বই, শর চন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র বা গল্পগুচ্ছ। উনুনের মুখে কয়লা দিয়ে মা পড়ে নিতেন কয়েকটা কয়েকটা স্তবক। ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করতেন মাগুর মাছের ঝোল, বাঁধাকপির ঘণ্ট, উচ্ছেআলু পোস্ত। আমরা বাঙ্গাল তো! আমাদের বাড়িতে রুটি হোত না। সকালে ছোট মাছের শুক্ত দিয়ে গরম গরম ভাত খেয়ে নিতাম। আমার সমস্ত সত্তায় সেই সব খাবারের স্বাদ গন্ধ স্মৃতি।

পয়লা বৈশাখ খুব আনন্দের দিন ছিল। সোনার দোকান মুদি দোকান থেকে নিমন্ত্রণ আসত। আমরা ছোট ছোট চার ভাই বোন অপেক্ষা করে থাকতাম সারাদিন। বিকেল হলেই ঠাকুমার হাত ধরে দোকান দোকান ঘুরে মিষ্টির প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করব। ক্যালেন্ডারে থাকত সব দেব দেবীর ছবি। একবার গৌ্রাঙ্গ আর কালীর ছবি বাঁধাতে দিয়েছিলাম। পয়লা বৈশাখে সবচেয়ে আনন্দ ছিল কল্পনা টিম্বার সাপ্লাই-এ। আমাদের আত্মিয়ের দোকান। খুব ভীড় হোত। গেলেই কাঁচের গেলাসে হলুদ রঙের সরবত। সে স্বাদ, সে অনুভূতি , সুখবোধ কখনও ভোলার নয়। হলুদ স্বপ্ন।

আমার মামাবাড়ি ছিল বেলেঘাটায়। আমরা চার ভাই বোন। চার জন চারটে স্কুলের বই রাখার এ্যলুমিনিয়ামের সুটকেস নিয়ে তাতে জামা কাপড় ভরে রওনা হতাম বেলেঘাটার দিকে। আমার ছোট্ট মা, ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে বাসে উঠতেন। একজন এগার, একজন আট,একজন ছয় আর একজন চার। বাসের ভাড়া তখন বোধহয় দশ পয়সা। এক টাকায় যাতায়াত হয়েও পয়সা থাকত। বাবাকে অফিস রওনা করিয়ে দিয়ে মার জীবনে ঐ টুকুই ছিল মুক্তি। আমার মার জ্যাঠামশাই, আমার দাদুর আদর যে কত ছিল! কত যে গাল ভরে ডাক খোঁজ করতেন। সে আদরের জন্যই বার বার মামা বাড়ি যেতাম। আমার মামাবাড়িতে অনেক লোকজন ছিল, বিরাট উঠোন, দোতলা বাড়ি, দোতলা যাওয়ার জন্য উঠোনের মাঝখান দিয়ে কাঠের সিঁড়ি। মানুষের জীবন তখন এত যন্ত্র দিয়ে বাঁধা ছিল না। টি ভি ছিল না, মোবাইল ছিল না, কম্পিউটার ছিল না। মামাবাড়ির বারান্দায় একটা রেডিও বাজত। অনুরোধের আসর হোত। নাটক হোত, অভিনয় করতেন নীলিমা দাস, খবর পড়তেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সকাল বেলায় দাদু খেতে বসতেন অফিস যাওয়ার আগে। মুসুর ডাল দিয়ে ভাত মাখতেন। গাঢ় হলুদ রঙের ডাল, দিদিমার হাতের। ভাত মেখে দলা পাকিয়ে পাকিয়ে, ডেকে ডেকে এর ওর মুখে দিতেন। বড় একটা হাঁ করে, গাল ফুলিয়ে সেই গড়াস গিলতাম। সেই দলা, সেই সকাল বেলার খিদে, সেই অপূর্ব স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।

এই রকম টুকরো টুকরো অনেক খাওয়া, জীবনের ফাঁকে ফাঁকে। কোনদিন ভুলব না। আমৃত্যু লেগে থাকবে তার স্বাদ। হলুদ সরবত, মাগুরের ঝোল, কষ্টা পেয়ারার রস বা ভাতের দলা। যখন বিয়ে করব ঠিক করলাম, আমার হবু বর আমাকে নিয়ে গেল তার বাড়ি। আমার গরীব শাশুড়ি, ছেলের স্বল্প মাইনের টাকায় ছয় জনের অন্ন যোগান। আমাকে আদর করে বসতে দিলেন, তারপর একটা ছোট্ট সন্দেশের বাক্স বের করে একটা সন্দেশ আমার মুখে দিলেন। কয়েক মুহুর্তের জন্য হতচকিত আমি। ঐ অভাবিত, আশীর্বাদ মাখা সন্দেশের স্বাদ আজও মুখে মনে জীবনে লেগে আছে। যত দিন বাঁচব ঐ স্বাদ ঐ মুহূর্ত বেঁচে থাকবে আমার জন্য।