আমার মামাবাড়ি ছিল বেলেঘাটায়। আমরা চার ভাই বোন। চার জন চারটে স্কুলের বই রাখার এ্যলুমিনিয়ামের সুটকেস নিয়ে তাতে জামা কাপড় ভরে রওনা হতাম বেলেঘাটার দিকে। আমার ছোট্ট মা, ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে বাসে উঠতেন। একজন এগার, একজন আট,একজন ছয় আর একজন চার। বাসের ভাড়া তখন বোধহয় দশ পয়সা। এক টাকায় যাতায়াত হয়েও পয়সা থাকত। বাবাকে অফিস রওনা করিয়ে দিয়ে মার জীবনে ঐ টুকুই ছিল মুক্তি। আমার মার জ্যাঠামশাই, আমার দাদুর আদর যে কত ছিল! কত যে গাল ভরে ডাক খোঁজ করতেন। সে আদরের জন্যই বার বার মামা বাড়ি যেতাম। আমার মামাবাড়িতে অনেক লোকজন ছিল, বিরাট উঠোন, দোতলা বাড়ি, দোতলা যাওয়ার জন্য উঠোনের মাঝখান দিয়ে কাঠের সিঁড়ি। মানুষের জীবন তখন এত যন্ত্র দিয়ে বাঁধা ছিল না। টি ভি ছিল না, মোবাইল ছিল না, কম্পিউটার ছিল না। মামাবাড়ির বারান্দায় একটা রেডিও বাজত। অনুরোধের আসর হোত। নাটক হোত, অভিনয় করতেন নীলিমা দাস, খবর পড়তেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সকাল বেলায় দাদু খেতে বসতেন অফিস যাওয়ার আগে। মুসুর ডাল দিয়ে ভাত মাখতেন। গাঢ় হলুদ রঙের ডাল, দিদিমার হাতের। ভাত মেখে দলা পাকিয়ে পাকিয়ে, ডেকে ডেকে এর ওর মুখে দিতেন। বড় একটা হাঁ করে, গাল ফুলিয়ে সেই গড়াস গিলতাম। সেই দলা, সেই সকাল বেলার খিদে, সেই অপূর্ব স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।
এই রকম টুকরো টুকরো অনেক খাওয়া, জীবনের ফাঁকে ফাঁকে। কোনদিন ভুলব না। আমৃত্যু লেগে থাকবে তার স্বাদ। হলুদ সরবত, মাগুরের ঝোল, কষ্টা পেয়ারার রস বা ভাতের দলা। যখন বিয়ে করব ঠিক করলাম, আমার হবু বর আমাকে নিয়ে গেল তার বাড়ি। আমার গরীব শাশুড়ি, ছেলের স্বল্প মাইনের টাকায় ছয় জনের অন্ন যোগান। আমাকে আদর করে বসতে দিলেন, তারপর একটা ছোট্ট সন্দেশের বাক্স বের করে একটা সন্দেশ আমার মুখে দিলেন। কয়েক মুহুর্তের জন্য হতচকিত আমি। ঐ অভাবিত, আশীর্বাদ মাখা সন্দেশের স্বাদ আজও মুখে মনে জীবনে লেগে আছে। যত দিন বাঁচব ঐ স্বাদ ঐ মুহূর্ত বেঁচে থাকবে আমার জন্য।

No comments:
Post a Comment