Saturday, November 14, 2009

চারপাশ জলে ভেসে আছে, বাঁধ ভেঙ্গে গেছে সাতজেলের এই ব্লকে। রোজ জোয়ারের জল ঢুকে পড়ছে। চাষের জমি বলতে কিছু নেই। সব জলে ডুবে আছে। যতদূর চোখ যায় জল আর জল। প্রথম তিনদিন খুব কান্না পেয়েছিল গো দিদি। এখন চোখে জল আসে না। আমাদের সারা বছর ধানে চালে, মাছ ধরে হয়ে যেত, এখন কী হবে গো দিদি! উদাস চোখে চেয়ে থাকা নারীরা কি হাল ছেড়ে দিচ্ছে! এখানে দূরের গ্রামে ত্রাণ দিয়ে ফেরার পথে ঐ তিন নারী আমার সঙ্গে সঙ্গে চলল নানা কথা বলতে বলতে। তখন সূর্য অস্তাচলের পথে। উঁচু-নীচু, এবড়ো- খেবড়ো পথ ধরে অনেকটা এলাম। এসে দেখি ভাটায় নৌকো অনেকটা দূরে সরে গেছে। বেশ খানিকটা অংশ কাদা ভাঙতে হবে। আমার এসব ভালই লাগে। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে একটু যাবার পরই কাদায় নামতে হবে। কাঠের সিঁড়িতে উঠে নৌকোর দিকে যাচ্ছি, দেখি সেই নীল শাড়ি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এস দিদি আমার হাত ধর। আমি তোমায় নিয়ে যাচ্ছি। ভয়ের কিছু নেই। আমি ঝুপ করে এক হাঁটু কাদায় নেমে পড়লাম। আমার হাত চেপে ধরে নীল শাড়ি আমাকে নৌকোয় উঠিয়ে দিল। তারপর দেখি একটু একটু করে নৌকো ঘিরে ধরেছে গ্রামবাসী ত্রাণের আশায়। কিছু কিছু জিনিস দেওয়া হতে লাগল। আমার সেই তিন নারীও আছে ওদের দলে। ইমানুলের কাছে তিনটে নতুন শাড়ি চাইতেই, শাড়ি এগিয়ে দিল। এগিয়ে দিতেই দীপঙ্কর ইমানুলের হাত থেকে শাড়ি তিনটে নিয়ে নিল। আমি পেছন থেকে চিৎকার করে উঠলাম দীপঙ্কর আমি দেব, ঐ শাড়ি আমি দেব ওদের। দীপঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে শাড়ি তিনটে আমার হাতে তুলে দিল। আমি ভিড়ের মাঝে ওই তিন নারীর হাতে তুলে দিলাম তিনটে নতুন শাড়ি। আমার আনন্দ হল। কেন জানিনা খুব আনন্দ হল। ওরা আমার হাত ধরেছিল বলে আনন্দ হল! ওদের ভাষা বুঝতে চেয়েছিলাম বলে আনন্দ হল! নতুন শাড়ি দিতে পেরে আনন্দ হল!

সন্ধ্যা নেমে এল। চারদিক অন্ধকার। নদীর বুকে আমরা তখনো ভাসছি। ঘরে ফিরছি আমরা অনেকে মিলে। আকাশে সপ্তর্ষিমন্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবতারা খুঁজছি। নিকষ কালো রাত্রিতে তারা ভরা আকাশ। আমাদের ফেলে ফেলে যাওয়া গ্রামগুলিতে, কোথাও কোথাও ছোট ছোট আলো জ্বলছে। ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট আশা কে রাখে খবর তার কে যেন গুন গুন করে গাইছে। নৌকোর পাটাতনের ওপর চুপচাপ বসে আছে কয়েকজন। কেউ কেউ সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

কী হবে ওদের যাদের ফেলে রেখে যাচ্ছি। এই বিরাট দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস মানুষকে কতটুকু সহায়তা করতে পারে! মানুষের এই বাড়িয়ে দেওয়া হাত মানুষকে ভিখিরি করে তুলবে না তো? কচুখালির সেই বয়স্ক লোকটার কথা মনে পড়ল। মানুষের বাড়ানো হাতের পাশ দিয়ে যার গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এসেছিল আপনারা এ ভাবে কতদিন দেবেন? আমাদের কাজ দিন, আমাদের কাজ দিন

No comments:

Post a Comment